ব্যর্থ স্বাধীনতা সবার জন্যই কলঙ্ক: ব্যারিস্টার মইনুল

সেমিনারে মূল প্রবন্ধের লেখক ড. সালেহউদ্দীন দেশের অর্থনীতির সবল ও দুর্বল দিক সম্পর্কে তার মূল্যবান পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। আমার পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জানাই। তিনিও বলেছেন, একটি দেহকে শুধু হাত-পা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।

স্বাধীন দেশের সরকার হবে জনগণের অধিকার রক্ষার সুশাসন। নির্বাচন হবে সরকারের বৈধতার ভিত্তি। এই দুর্ভাগা দেশে নির্বাচনে অনেক কারচুপি-অনিয়ম-প্রহসন হয়েছে, এবারো তেমন যে কিছু হবে সেটা আমি আশঙ্কা করেছিলাম; কিন্তু জেল থেকে বেরিয়ে আমাকে পুরোপুরি ভোট ডাকাতির কাহিনী শুনতে হলো। বুঝলাম, দেশে ভোটের রাজনীতির মৃত্যু হয়েছে। পুলিশি শক্তির অপব্যবহার করতে পারলেই হলো। সামগ্রিকভাবে তাই জনগণ প্রশাসনের কাছে অসহায়।

যে বর্বরোচিত পন্থায় মাদরাসাছাত্রী নুসরাতকে হত্যা করা হয়েছে তা জনগণের অসহায়ত্বের চরম দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি। তার অসহায় মৃত্যু প্রতিটি বিবেকবান ব্যক্তির অনুভূতিতে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়েছে। প্রতিদিনই আমাদের মেয়েরা কোথাও-না-কোথাও ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে। সেইসাথে দায়িত্ব পালনে আমাদের জাতিগত ব্যর্থতারও লজ্জাকর চিত্র প্রকটিত হচ্ছে।

নুসরাতের হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি সরকারের কাছে রাখা হয়নি, পুলিশের কাছে তো নয়ই, সে দাবি রাখা হয়েছে জাতির বিবেকের কাছে। স্থানীয় পুলিশ, মাদরাসার অধ্যক্ষ ও রাজনৈতিক নেতারা মেয়েটির অসহায়ত্ব জেনেই তার ওপর নির্যাতন চালাতে সাহস পেয়েছে। এমনকি তার বেঁচে থাকার মানবিক ও শাসনতান্ত্রিক অধিকারের কথাটিও তাদের ভাবতে হয়নি। অন্যায়ের প্রতিবাদে থানায় রুজু করা মামলা উঠিয়ে নিতে রাজি না হওয়ায় তাকে প্রকাশ্যে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীদের আইন বা সরকারের তোয়াক্কা করতে হয়নি। নুসরাতের মতো অনেককেই প্রতিদিন ক্ষমতাধরদের নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।

সব অন্যায় ও অবিচারের কাছে আমরা ১৭ কোটি লোক অসহায় হয়ে আছি। নিজের দেশে নিজেদের রাষ্ট্রীয় শক্তির ভয়-ভীতির আতঙ্কে আমরা আছি। সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে এই আত্মসচেতনতার অভাব যে স্বাধীন দেশের সরকারি কর্মচারীরা এখন আর পরাধীন আমলের চাকর নন।

জনগণের ভোট হরণ করে যে সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে হয়, সে সরকারের ব্যর্থতার কথা, গণ-ভীতির কথা অন্যদের বলতে হয় না। জনগণের ভোটাধিকার অস্বীকার করাই সরকারের চরম ব্যর্থতার স্বীকৃতি।

ভোটাধিকারের দাবি নাগরিকত্বের দাবি। ভোটাধিকার রক্ষা করতে না পারার ব্যর্থতা দলীয় রাজনীতির ব্যর্থতা নয়, আমাদের স্বাধীনতার ব্যর্থতা। স্বাধীনতার অর্থ স্বাধীনভাবে সরকার গঠনের স্বাধীনতা, দেশ পরিচালনায় অংশ নেয়ার অধিকার। স্বাধীনতা জনগণের, সরকারের নয়। সরকারের থাকতে হবে জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনের দায়বদ্ধতা।

কিন্তু যারা ভয়-ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে জনগণকে অসহায় করে রেখেছে, তারা কী এ দেশের লোক নয়? তারা কী স্বাধীন দেশের মর্যাদা ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে একেবারেই উদাসীন? দেশ তো আমাদের সবার। সবাই
মিলে নিরাপদে থাকার কথা ভাবতে হবে।
সুপ্রিম কোর্ট নড়বড়ে অবস্থায় বিচারব্যবস্থাকে কোনোভাবে ধরে রাখছে। নিম্ন আদালতের জজ-বিচারকদের চাপের মুখে রাখতে সরকারের অসুবিধা হচ্ছে। আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব নিজেই অহরহ ফোন করে জজ-ম্যাজিস্ট্রেটদের করণীয় নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। জনগণের সুবিচার পাওয়ার অসহায়ত্বের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সর্বক্ষেত্রে। অপর দিকে, আইনমন্ত্রী বলছেন, বিচার বিভাগ স্বাধীন বলেই দুর্নীতিপরায়ণরা পার পাচ্ছে। সরকার এত সাধু হলে ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতায় থাকতে হতো না। পুলিশি মামলা দিতে সরকারকে আইনের কথা ভাবতে হয় না। সরকারই আইন। জামিন না পেলেই লক্ষ্য হাসিল।

ভয়-ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্কের মধ্যে জনসমষ্টিকে রাখা স্বাধীনতা নয়। দেশে চলছে মুষ্টিমেয় সুবিধাবাদীর সরকার। সরকার পরিচালনায় সেই গোষ্ঠীই প্রভাবশালী যারা জনগণকে নির্বাচন থেকে বঞ্চিত করতে সাহায্য করেছে। তাদের কাছে মিথ্যাই সত্য, দুর্নীতিই সততা। তাদের উন্নয়নই দেশের উন্নয়ন। জিডিপিকেন্দ্রিক উন্নয়নের বড় বড় দাবির সমর্থনে তথ্য প্রকাশে সরকারের অস্বীকৃতি বোধগম্য।
ছাত্রী নুসরাত নিজের জীবন দিয়েছে; কিন্তু তার অধিকারের প্রশ্নে আপস করেনি। আপসহীন হওয়ার যে প্রতিবাদী সাহসের দৃষ্টান্ত সে রেখে গেছে, তা বৃথা যাওয়ার নয়। বুদ্ধিবৃত্তির নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি অসম্ভব করলেই সঙ্কটের অবসান হয় না।

আমরা নিশ্চয়ই একটি মূর্খ ও অযোগ্য জাতি নই যে, নিজেদের ভোটের দাবি এবং বিচার পাওয়ার দাবি থেকে বঞ্চিত থেকে যাবো- দেশে সরকার থাকবে, জনগণের সুশাসন থাকবে না।

(লেখাটি গত ২৭ এপ্রিল, ২০১৯ জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘ঢাকা ফোরাম’ আয়োজিত সেমিনারে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের প্রদত্ত বক্তব্য)
উৎসঃ নয়াদিগন্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *